শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

Causes, Symptoms, and Treatment of Congenital Heart Disease in Children

“শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা” – ডা. দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা (পেডিয়াট্রিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, কলকাতা, ভারত)

সন্তানের সুস্থতা ও তার মুখের মিষ্টি হাসি প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ। কিন্তু অনেক সময় জন্মের পর থেকেই কিছু শিশু এমন কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্মায় যা বাবা-মায়েদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে অন্যতম একটি বড় সমস্যা হলো শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ বা হার্টের ত্রুটি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রগতির ফলে আজ বেশিরভাগ জন্মগত হৃদরোগই সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব। মা-বাবা ও সাধারণ মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করতে আজ আমরা আলোচনা করব শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease), এর কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে।

সন্তানের সুস্থতা ও তার মুখের মিষ্টি হাসি প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ। কিন্তু অনেক সময় জন্মের পর থেকেই কিছু শিশু এমন কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্মায় যা বাবা-মায়েদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে অন্যতম একটি বড় সমস্যা হলো শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ বা হার্টের ত্রুটি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রগতির ফলে আজ বেশিরভাগ জন্মগত হৃদরোগই সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব। মা-বাবা ও সাধারণ মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করতে আজ আমরা আলোচনা করব শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease), এর কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে।

জন্মগত হৃদরোগ বা কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ কী? (What is Congenital Heart Disease in Children?)

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, শিশু মাতৃগর্ভে থাকাকালীন যদি তার হৃদপিণ্ডের গঠন বা রক্তনালীতে কোনো ধরণের ত্রুটি বা অসঙ্গতি তৈরি হয় এবং শিশুটি সেই ত্রুটি নিয়ে জন্মায়, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে জন্মগত হৃদরোগ বা Congenital Heart Disease (CHD) বলা হয়। এটি শিশুদের মধ্যে দেখা দেওয়া অন্যতম সাধারণ জন্মগত ত্রুটি (Birth Defect)। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জন নবজাতকের মধ্যে গড়ে ১ জন শিশু এই ধরণের জন্মগত হার্টের সমস্যা নিয়ে জন্মাতে পারে।

আমরা সাধারণ অর্থে ‘হার্টের ফুটো’ কথাটি খুব বেশি ব্যবহার করলেও, জন্মগত হৃদরোগ কিন্তু মূলত তিন ধরণের হতে পারে:

১. অ্যাসায়ানোটিক হার্ট ডিজিজ (Acyanotic Heart Disease): এই ধরণের ত্রুটিতে বাচ্চার শরীর নীল হয়ে যায় না। তবে হার্টের প্রকোষ্ঠগুলোর মাঝখানের দেয়ালে ছিদ্র থাকার কারণে ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্ত জমা হয়। এর সবচেয়ে সাধারণ উদাহরণ হলো অলিন্দের মধ্যবর্তী দেয়ালের ছিদ্র বা এট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট (ASD) এবং নিলয়ের দেয়ালের ছিদ্র বা ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (VSD)। এছাড়া পেটেন্ট ডাক্টাস আর্টারিওসাস (PDA)-ও এর অন্তর্ভুক্ত। 

২. সায়ানোটিক হার্ট ডিজিজ (Cyanotic Heart Disease): এই ক্ষেত্রে হার্টের গঠনের ত্রুটির কারণে শরীরে অক্সিজেন সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ রক্তের সরবরাহ কমে যায়। ফলে বাচ্চার ঠোঁট, জিভ ও নখ নীলচে বা কালচে রঙের দেখায় (Cyanosis)।

 ৩. কমপ্লেক্স বা মিক্সড লিশন (Complex / Mixed Defects): এটি তুলনামূলকভাবে জটিল সমস্যা, যেখানে হার্টের ভেতরে বিশুদ্ধ এবং দূষিত রক্ত একসাথে মিশে যায় এবং রক্তসঞ্চালনে মারাত্মক অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

এই ধরণের যেকোনো জন্মগত ত্রুটি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর দ্রুত পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের কারণ (Causes of Congenital Heart Disease)

বাচ্চা যখন মায়ের পেটে বড় হতে শুরু করে, তখন গর্ভাবস্থার অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থাৎ ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ বয়সের মধ্যে ভ্রূণের হৃদপিণ্ডটি গঠিত হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ে যদি হার্টের স্বাভাবিক গঠনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তবেই জন্মগত হৃদরোগ দেখা দেয়। এর সুনির্দিষ্ট কোনো একক কারণ সবসময় জানা যায় না, তবে কিছু প্রধান কারণ ও ঝুঁকি নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • জিনগত বা ক্রোমোজোমাল অসঙ্গতি: ডাউন সিন্ড্রোমের মতো কিছু ক্রোমোজোমাল ত্রুটি থাকলে বাচ্চাদের হার্টের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
  • বংশগত ইতিহাস: পরিবারে অন্য কোনো সন্তানের বা মা-বাবার জন্মগত হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়ে।
  • মায়ের শারীরিক অসুস্থতা: গর্ভাবস্থায় মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে বা প্রথম তিন মাসের মধ্যে রুবেলা (জার্মান মিজলস) বা অন্য কোনো মারাত্মক ভাইরাল ইনফেকশন হলে ভ্রূণের হার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
  • ওষুধ ও লাইফস্টাইল: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া গর্ভাবস্থায় কিছু বিশেষ ওষুধ সেবন করা, মদ্যপান বা ধূমপানের অভ্যাস গর্ভস্থ শিশুর হৃদপিণ্ডের গঠনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

জন্মগত হৃদরোগের লক্ষণসমূহ (Symptoms)

কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চার হার্টের ত্রুটি ছোট হলে তা সম্পূর্ণ অ্যাসিম্পটোম্যাটিক (Asymptomatic) বা লক্ষণহীন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্টেথোস্কোপের সাহায্যে হার্টে অস্বাভাবিক শব্দ বা মারমার (Murmur) শুনে রোগটি সন্দেহ করা হয়। তবে ত্রুটি মাঝারি বা বড় হলে বাচ্চার শরীরে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:

  • শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া: বাচ্চা যখন শুয়ে থাকে বা ঘুমায়, তখনও তার শ্বাস-প্রশ্বাস খুব দ্রুত চলে এবং বুক ওঠানামা করে।
  • দুধ খাওয়ার সময় ক্লান্তি ও ঘাম: নবজাতক শিশুরা মায়ের দুধ খাওয়ার সময় খুব দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠে, কপালে প্রচুর ঘাম জমে এবং সে বারবার দুধ খাওয়া থামিয়ে দেয়।
  • স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া (Poor Growth): বাচ্চার খাওয়া-দাওয়া ঠিক থাকলেও তার গ্রোথ বা ওজন স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো বাড়ে না।
  • ত্বক ও ঠোঁট নীলচে হওয়া (Cyanosis): সায়ানোটিক হার্ট ডিজিজের ক্ষেত্রে বাচ্চার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকায় তার ঠোঁট, জিব, নখ এবং গায়ের চামড়া নীলচে বা কালচে হয়ে যায়।
  • ঘন ঘন বুকে ইনফেকশন: এই শিশুদের খুব দ্রুত ঠান্ডা লাগে এবং বারবার নিউমোনিয়া বা রেসপিরেটরি ইনফেকশন হতে দেখা যায়।

আপনার বা আপনার পরিচিত কোনো শিশুর মধ্যে এই লক্ষণগুলো লক্ষ্য করলে অবিলম্বে একজন কলকাতায় শিশুদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর শরণাপন্ন হোন।

জন্মগত হৃদরোগ নির্ণয় পদ্ধতি (Diagnosis of Congenital Heart Disease)

আজকের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাচ্চার হার্টের রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত সহজ ও নির্ভুল হয়ে উঠেছে। মূলত কয়েকটি সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা রোগটি সম্পূর্ণ নিশ্চিত করতে পারি:

  • ফেটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Fetal Echocardiography): এটি গর্ভাবস্থায় বাচ্চার হার্টের রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে আধুনিক পরীক্ষা। বাচ্চা মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই (১৮ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে) এই বিশেষ আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে হার্টের বড় ত্রুটিগুলো শনাক্ত করা যায়। বর্তমানে কলকাতায় ফেটাল ইকো কার্ডিওগ্রাফি টেস্ট করার সমস্ত বিশ্বমানের সুবিধা উপলব্ধ রয়েছে, যা জন্মের আগেই সঠিক চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।
  • পেডিয়াট্রিক ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Echocardiography): জন্মের পর বাচ্চার হার্টের অলিন্দ ও নিলয়ের ছিদ্রের সঠিক অবস্থান, আকার এবং রক্তপ্রবাহের গতি কালার ডপলার ইকোকার্ডিওগ্রাফির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে মাপা যায়। এটি সম্পূর্ণ ব্যথাহীন এবং নিরাপদ পরীক্ষা।
  • ইসিজি (ECG) ও চেস্ট এক্স-রে (Chest X-ray): হার্টের আকার এবং ফুসফুসে রক্তপ্রবাহের অবস্থা বোঝার জন্য এই পরীক্ষাগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

বিশেষ করে সদ্যোজাত শিশুদের জটিল সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসার দিশা দেখানোর জন্য কলকাতায় নবজাতকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-দের ভূমিকা অতুলনীয়।

চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ (Line of Treatment of Congenital Heart Disease)

বাচ্চার হার্টের রোগ বা ফুটোর চিকিৎসা মূলত তার আকার, অবস্থান এবং উপসর্গের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। এর প্রধান ধাপগুলো হলো:

নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (Observation)

যদি ইকোকার্ডিওগ্রাফিতে দেখা যায় বাচ্চার হার্টের ছিদ্রটি (ASD বা VSD) আকারে অত্যন্ত ছোট এবং বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠিক আছে, তবে কোনো ওষুধ বা অপারেশনের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত ফলো-আপে রাখলে বাচ্চার বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে এই ছোট ফুটোগুলো নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়।

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা (Medical Management)

মাঝারি বা বড় আকারের ফুটো থাকলে ফুসফুস ও হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এই চাপ কমাতে এবং বাচ্চার শ্বাসকষ্ট দূর করতে আমরা কিছু বিশেষ ওষুধ দিয়ে থাকি। এই ওষুধগুলো বাচ্চার শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের করে দেয় এবং হার্টকে সচল রাখে, যাতে বাচ্চার ওজন ঠিকমতো বাড়ে এবং সে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

নন-সার্জিক্যাল পদ্ধতি বা ডিভাইস ক্লোজার (Device Closure)

এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক চমৎকার আবিষ্কার। এখন অনেক ধরণের এএসডি (ASD) বা ভিএসডি (VSD) কোনো রকম কাটাকাটি বা বুক না কেটেই বন্ধ করা সম্ভব। কুঁচকির একটি ছোট শিরার মধ্য দিয়ে ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে হার্টের ফুটোর জায়গায় একটি ছাতার মতো বিশেষ ডিভাইস বা ‘বোতাম’ বসিয়ে দেওয়া হয়। এই ইন্টারভেনশনাল পদ্ধতিতে কোনো অপারেশনের দাগ বা স্কার থাকে না এবং বাচ্চা ২-৩ দিনের মধ্যেই হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যেতে পারে।

ওপেন হার্ট সার্জারি (Surgical Closure)

যদি বাচ্চার হার্টের ফুটোটি খুব বড় হয় বা ত্রুটি অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির হয়, সে ক্ষেত্রে ওপেন হার্ট সার্জারির প্রয়োজন পড়ে। সাধারণত বাচ্চার বয়স এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই অপারেশন করে ফেলা উচিত, কারণ সঠিক সময়ে অপারেশন করলে বাচ্চার হার্ট ও ফুসফুস স্থায়ী ক্ষতির হাত থেকে বাঁচে এবং এর সাফল্যের হার সবচেয়ে ভালো আসে। দক্ষ একজন কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসক-এর তত্ত্বাবধানে অপারেশন করা হলে ভয়ের কোনো কারণ থাকে না। অপারেশনের পর শিশুটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবন ফিরে পায়।

কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসার ক্লিনিক ও হাসপাতাল (Clinics and Hospitals in Kolkata)

কলকাতা এখন পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র। শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের সফল চিকিৎসার জন্য এখানে বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে।

  • নারায়ণা হেলথ / আর.এন. টেগোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস (RTIICS), মুকুন্দপুর: শিশুদের জটিল হার্টের রোগ এবং ফুটোর চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালটি সমগ্র পূর্ব ভারতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। এখানে অত্যন্ত আধুনিক পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ এবং মডার্ন ক্যাথ ল্যাব রয়েছে, যেখানে আমি নিজে এবং আমাদের বিশেষজ্ঞ টিম ২৪ ঘণ্টা শিশুদের চিকিৎসায় নিয়োজিত আছি। এখানে অত্যন্ত সফলভাবে ডিভাইস ক্লোজার ও জটিল হার্ট সার্জারি করা হয়।
  • বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার: কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও নামী হার্ট হসপিটাল, যেখানে শিশুদের হৃদরোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।
  • অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালস: উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে এখানে জন্মগত হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসা করা হয়।
  • সরকারি হাসপাতালসমূহ (SSKM / IPGMER এবং আর জি কর মেডিকেল কলেজ): এই শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালগুলোতেও প্রকল্পের অধীনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা অত্যন্ত কম খরচে শিশুদের জন্মগত হার্টের ফুটোর সফল অপারেশন ও চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।

মা-বাবাদের প্রতি আমার পরামর্শ

আপনার সন্তানের হার্টে সমস্যা ধরা পড়ার অর্থ এই নয় যে সব শেষ হয়ে গেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জন্মগত হৃদরোগ কোনো নিরাময় অযোগ্য ব্যাধি নয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শই আপনার সন্তানকে একটি সুন্দর ও দীর্ঘ জীবন উপহার দিতে পারে। তাই ভয় না পেয়ে, গুজবে কান না দিয়ে সচেতন হোন। যদি আপনার শিশুর মধ্যে উপরে উল্লেখিত কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

যোগাযোগ ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট: ডক্টর দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং এবং চেম্বারের সময়সূচী জানার জন্য আপনি কলকাতার মুকুন্দপুরে অবস্থিত আর. এন. টেগোর হসপিটালে (RTIICS) যোগাযোগ করতে পারেন। ওনার সাথে পরামর্শের দিন ও উপলব্ধতা (Availability) সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সরাসরি কল বা হোয়াটসঅ্যাপ করতে পারেন +91 8585077458 এই হেল্পলাইন নম্বরে।

শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs)

প্রশ্ন ১: শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease) আসলে কী?

উত্তর: শিশু মাতৃগর্ভে থাকাকালীন যদি তার হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক গঠনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং হৃদপিণ্ডের পেশী, দেয়াল, ভালভ বা প্রধান রক্তনালীতে কোনো ত্রুটি তৈরি হয়, তবে তাকে জন্মগত হৃদরোগ বা Congenital Heart Disease (CHD) বলা হয়। এটি শিশুর জন্মের পর থেকেই থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো হার্টের ভেতরের দেয়ালে ছিদ্র থাকা, যাকে অলিন্দের দেয়ালের ছিদ্র (ASD) বা নিলয়ের দেয়ালের ছিদ্র (VSD) বলা হয়ে থাকে。

প্রশ্ন ২: গর্ভাবস্থায় বাচ্চার হার্টের রোগ বা Fetal Heart Disease কেন হয়?

উত্তর: গর্ভাবস্থার অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে, বিশেষ করে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ বয়সের মধ্যে গর্ভস্থ ভ্রূণের হৃদপিণ্ড তৈরি হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ে কোনো কারণে হার্টের গঠনে অসঙ্গতি দেখা দিলে এই রোগ হয়। এর সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় জানা না গেলেও, কিছু প্রধান কারণ হলো—পরিবারে জন্মগত হৃদরোগের ইতিহাস থাকা, গর্ভাবস্থায় মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, গর্ভাবস্থার শুরুতে কোনো ক্ষতিকর ওষুধ সেবন অথবা মায়ের রুবেলার মতো কোনো মারাত্মক ভাইরাল ইনফেকশন হওয়া।

প্রশ্ন ৩: বাচ্চার হার্টে রোগ বা ফুটো থাকলে কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

উত্তর: বাচ্চার হার্টের ত্রুটি যদি মাঝারি বা বড় আকারের হয়, তবে মূলত এই লক্ষণগুলি দেখা যায়:

  • মায়ের দুধ খাওয়ার সময় শিশু খুব দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠে এবং কপালে-মুখে প্রচুর ঘাম জমে।
  • বাচ্চার গায়ের ওজন এবং শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো বাড়ে না।
  • সামান্য ঠাণ্ডা লাগলেই বাচ্চার বুকে ইনফেকশন বা ঘন ঘন নিউমোনিয়া হয়।
  • কান্না করার সময় বা স্বাভাবিক অবস্থায় বাচ্চার ঠোঁট, জিব, হাত-পায়ের নখ নীলচে হয়ে যায় (সায়ানোসিস)।
  • শিশু একটু বড় হলে সামান্য খেলাধুলা বা দৌড়াদৌড়ি করলেই দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং হাঁপাতে থাকে।

এই ধরণের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় শিশুদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন ৪: গর্ভাবস্থায় কি গর্ভস্থ শিশুর হার্টের রোগ নির্ণয় করা সম্ভব?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে গর্ভাবস্থার ১৮ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে মায়ের পেটের আল্ট্রাসাউন্ডের মতোই একটি বিশেষ পরীক্ষা করা হয়, যাকে ফেটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Fetal Echocardiography) বলা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে মাতৃগর্ভেই বাচ্চার হার্টের গঠনগত ত্রুটি নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে। বর্তমানে কলকাতায় ফেটাল ইকো কার্ডিওগ্রাফি টেস্ট করার সমস্ত অত্যাধুনিক ও বিশ্বমানের সুবিধা উপলব্ধ রয়েছে, যা শিশুর জন্মের পর দ্রুত সঠিক চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে অত্যন্ত সাহায্য করে。

প্রশ্ন ৫: বাচ্চার হার্টের ফুটো কি নিজে থেকেই ভালো হয়ে যেতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ, অনেক বাচ্চার ক্ষেত্রেই এটি নিজে থেকে ভালো হয়ে যায়। যদি ইকোকার্ডিওগ্রাফি পরীক্ষায় দেখা যায় যে বাচ্চার হার্টের ফুটোটি (ASD বা VSD) আকারে খুবই ছোট এবং বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠিকঠাক হচ্ছে, তবে কোনো ওষুধ বা অপারেশনের প্রয়োজন হয় না। বাচ্চার বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং হার্টের বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ছোট ফুটোগুলো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে নিজে থেকেই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়ে একজন কলকাতায় শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর অধীনে বাচ্চাকে নিয়মিত ফলো-আপে রাখতে হয়।

প্রশ্ন ৬: কোনো রকম কাটাকাটি বা অপারেশন ছাড়াই কি বাচ্চার হার্টের ফুটো বন্ধ করা সম্ভব?

উত্তর: হ্যাঁ, আধুনিক ইন্টারভেনশনাল টেকনিকের কল্যাণে এখন ছোট থেকে মাঝারি আকারের অনেক ফুটোই কোনো রকম বুক না কেটে বা অপারেশন ছাড়াই সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব। একে ডিভাইস ক্লোজার (Device Closure) বলা হয়। এই পদ্ধতিতে বাচ্চার কুঁচকির একটি ছোট শিরার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সরু ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে হার্টের ফুটোর জায়গায় একটি ছাতার মতো বিশেষ ডিভাইস বা ‘বোতাম’ বসিয়ে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে বাচ্চার বুকে কোনো কাটার দাগ থাকে না এবং ২-৩ দিনের মধ্যেই শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে।

প্রশ্ন ৭: সদ্যোজাত বা নবজাতক শিশুর হার্টের সমস্যা ধরা পড়লে কার সাথে যোগাযোগ করব?

উত্তর: সদ্যোজাত বা নবজাতক শিশুদের হার্টের গঠনগত ত্রুটি এবং রক্তসঞ্চালনের সমস্যা বড়দের বা একটু বড় বাচ্চাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির হয়। তাই জন্মের পরপরই যদি শিশুর হার্টে কোনো সমস্যা বা অস্বাভাবিক শব্দ (Murmur) ধরা পড়ে, তবে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় নবজাতকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তারা পেডিয়াট্রিক ইকোকার্ডিওগ্রাফি পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক রোগ ও তার তীব্রতা নির্ধারণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

প্রশ্ন ৮: কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের আধুনিক ও সফল চিকিৎসা কোথায় হয়?

উত্তর: কলকাতা এখন শিশু হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত উন্নত ও নির্ভরযোগ্য একটি কেন্দ্র। কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসা-র জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হলো মুকুন্দপুরের নারায়ণা হেলথ / রবীন্দ্রনাথ টেগোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস (RTIICS)। এখানে অত্যন্ত অভিজ্ঞ শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ টিম ও কার্ডিয়াক সার্জনদের তত্ত্বাবধানে এবং মডার্ন ক্যাথ ল্যাবের সাহায্যে প্রতিদিন অত্যন্ত সফলভাবে পেডিয়াট্রিক ইন্টারভেনশন ও ওপেন হার্ট সার্জারি করা হচ্ছে। এছাড়া বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার ও অ্যাপোলো হসপিটালেও এই চিকিৎসা করা হয়। পাশাপাশি সরকারি স্তরে SSKM বা আর জি কর হাসপাতালেও ‘শিশু সাথী’ প্রকল্পের অধীনে অত্যন্ত সফলভাবে শিশুদের হার্টের অপারেশন করা হয়ে থাকে।

প্রশ্ন ৯: আমি কীভাবে ডক্টর দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে কনসালটেশন বা পরামর্শের জন্য সময় নির্ধারণ (Schedule) করতে পারি?

উত্তর: ডক্টর দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে কনসালটেশন বা পরামর্শের সময় নির্ধারণ করার জন্য আপনি কলকাতার আর. এন. টেগোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিয়াক সায়েন্সেস (R N Tagore International Institute of Cardiac Sciences)-এ যোগাযোগ করতে পারেন এবং সেখানে অ্যাপয়েন্টমেন্টের উপলব্ধতা (Availability) সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিতে পারেন।