বাচ্চার হার্টে ফুটো কি? বাচ্চার হার্টের ফুটোর কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা

What is a hole in a child's heart? Causes, symptoms, and treatment of a hole in a child's heart.

“বাচ্চার হার্টে ফুটো কি? বাচ্চার হার্টের ফুটোর কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা” – ডা. দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা (পেডিয়াট্রিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, কলকাতা, ভারত)

যখন কোনো মা-বাবা জানতে পারেন যে তাদের ছোট্ট সন্তানের হার্টে ফুটো বা ছিদ্র রয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মনের মধ্যে ভিড় করে হাজারো প্রশ্ন-বাচ্চাটি কি স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারবে? এর কি অপারেশন লাগবে? এটা কেন হলো? একজন কলকাতায় শিশুদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় আমি এমন অসংখ্য চিন্তিত মা-বাবার মুখোমুখি হই। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে এই সমস্যাটি এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কনজেনিটাল হার্ট ডিফেক্ট’ (Congenital Heart Defect) বা জন্মগত হৃদরোগ বলা হয়।

আজকের এই ব্লগে আমি আপনাদের অত্যন্ত সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করব যে বাচ্চার হার্টে ফুটো আসলে কী, এর কারণ, লক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ঠিক কী রকম।

বাচ্চার হার্টে ফুটো কি? (What is a Hole in a Child’s Heart?)

 

সাধারণ ভাষায় আমরা যখন বলি “বাচ্চার হার্টে ফুটো”, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে হার্টের ভেতরের দেওয়ালে বা পর্দায় কোনো ছিদ্র বা ত্রুটি থাকাকে বোঝানো হয়। মানুষের হৃদযন্ত্র বা হার্টে চারটি প্রকোষ্ঠ বা চেম্বার থাকে-ওপরের দুটিকে বলা হয় অ্যাট্রিয়াম (Atrium) এবং নিচের দুটিকে বলা হয় ভেন্ট্রিকল (Ventricle)। হার্টের ডান ও বাম দিকের এই চেম্বারগুলোর মাঝে একটি দেওয়াল বা পর্দা থাকে, যা অক্সিজেনযুক্ত বিশুদ্ধ রক্ত এবং কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত অশুদ্ধ রক্তকে আলাদা রাখতে সাহায্য করে।

যখন কোনো শিশু জন্মগতভাবে এই দেওয়ালে কোনো ছিদ্র বা ফাঁক নিয়ে জন্মায়, তখন তাকে হার্টে ফুটো বলা হয়। এর ফলে হার্টের স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়, বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধ রক্ত মিশে যায় এবং ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্ত প্রবাহিত হতে শুরু করে। ডক্টর দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, সাধারণ মানুষ অনেক সময় যেকোনো হার্টের অসুখ বোঝাতেই ‘হার্টের ফুটো’ কথাটি লুজলি ভাবে ব্যবহার করেন, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সুনির্দিষ্ট অর্থ ও প্রকারভেদ রয়েছে।

বাচ্চার হার্টের ফুটোর প্রকারভেদ (Types of Holes in a Child’s Heart)

শিশুদের হার্টের ফুটো সাধারণত প্রধান দুটি ভাগে বিভক্ত:

১. অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট (ASD – Atrial Septal Defect): হার্টের ওপরের দুটি চেম্বার বা অ্যাট্রিয়ামের মধ্যবর্তী দেওয়ালে যদি কোনো ছিদ্র থাকে, তবে তাকে এএসডি (ASD) বা অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট বলা হয়। এর ফলে বাম অ্যাট্রিয়াম থেকে বিশুদ্ধ রক্ত ফুটো গলে ডান অ্যাট্রিয়ামে চলে যায়।

২. ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (VSD – Ventricular Septal Defect): হার্টের নিচের দুটি প্রধান পাম্পিং চেম্বার বা ভেন্ট্রিকলের মধ্যবর্তী দেওয়ালে ছিদ্র থাকলে তাকে ভিএসডি (VSD) বা ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট বলা হয়। এটি শিশুদের মধ্যে দেখা যাওয়া সবচেয়ে সাধারণ হার্টের ফুটো (প্রায় ২৬% জন্মগত হৃদরোগ এই ধরণের হয়ে থাকে)। এর ফলে বাম ভেন্ট্রিকল থেকে উচ্চ চাপে রক্ত ডান ভেন্ট্রিকলে এবং পরবর্তীতে ফুসফুসে চলে যায়, যা ফুসফুসের কার্যক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

৩. পেটেন্ট ডাক্টাস আর্টেরিওসাস (PDA): এটি সরাসরি হার্টের চেম্বারের ভেতরের ফুটো নয়, বরং হার্টের প্রধান দুটি প্রধান রক্তনালীর মধ্যকার একটি সংযোগকারী নালী, যা জন্মের পর স্বাভাবিক নিয়মে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও খোলা থেকে যায় এবং রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটায়।

বাচ্চার হার্টের ফুটোর কারণ (Causes of a Hole in a Child’s Heart)

গর্ভে বাচ্চার হৃদযন্ত্র বা হার্ট তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল। গর্ভাবস্থার প্রথম ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চার হার্ট গঠিত হয়। ঠিক এই সময়ে কোনো কারণে হার্টের গঠন সম্পূর্ণ না হলে দেওয়ালে ছিদ্র বা ফুটো থেকে যায়। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে কিছু বিশেষ ঝুঁকি বা পরিবেশগত ও জিনগত কারণকে এর জন্য দায়ী করা হয়:

  • জিনগত বা ক্রোমোজোমাল ত্রুটি: অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ডাউন সিনড্রোম (Down Syndrome/Trisomy 21), টার্নার সিনড্রোম বা ডিজর্জ সিনড্রোমের মতো ক্রোমোজোমাল সমস্যার কারণে হার্টের গঠন ঠিকমতো হয় না। পরিবারে যদি অন্য কারো জন্মগত হৃদরোগের ইতিহাস থাকে, তবে এই ঝুঁকি বেড়ে যায়।

  • মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস: গর্ভাবস্থার আগে বা গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তে শর্করার মাত্রা বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে গর্ভস্থ শিশুর হার্টে ফুটো বা অন্যান্য জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা অনেক বৃদ্ধি পায়।

  • গর্ভাবস্থায় ভাইরাল সংক্রমণ: গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসের মধ্যে মা যদি রুবেলা (German Measles) বা অন্য কোনো মারাত্মক ভাইরাল ইনফেকশনে আক্রান্ত হন, তবে বাচ্চার হার্টের গঠনে ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

  • কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গর্ভাবস্থায় কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমন খিঁচুনি প্রতিরোধী বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ) খেলে এই ঝুঁকি বাড়ে।

  • ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবন: গর্ভাবস্থায় মায়ের ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান বা অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস শিশুর জন্মগত হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।

  • অধিক বয়সে গর্ভাবস্থা: ৩৫ বছরের বেশি বয়সে মা হলে ক্রোমোজোমাল ত্রুটিযুক্ত শিশু জন্মানোর ঝুঁকি বেশি থাকে, যা হার্টের ফুটোর কারণ হতে পারে।

বাচ্চার হার্টের ফুটোর লক্ষণ (Symptoms of a Hole in a Child’s Heart)

হার্টের ফুটোর লক্ষণ বা উপসর্গগুলো ফুটোটির আকার (ছোট, মাঝারি বা বড়) এবং অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। ছোট ফুটো থাকলে অনেক সময় কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না এবং বাচ্চা সাধারণভাবেই বড় হয়। তবে মাঝারি বা বড় আকারের ফুটো থাকলে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়:

নবজাতক এবং ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণ:

  • দুধ খাওয়ার সময় কষ্ট ও অতিরিক্ত ঘাম: বাচ্চা যখন মায়ের দুধ বা ফর্মুলা দুধ খায়, তখন তার প্রচুর ক্লান্তি আসে। শিশু খুব দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠে, দুধ খাওয়া থামিয়ে দেয় এবং বিশেষ করে কপালে ও মাথায় অতিরিক্ত ঘাম দেখা যায়।

  • ওজন বৃদ্ধি না পাওয়া (Failure to Thrive): হার্টের ত্রুটির কারণে শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি ও অক্সিজেন পায় না, ফলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং সমবয়সী বাচ্চাদের তুলনায় ওজন ঠিকমতো বাড়ে না।

  • দ্রুত শ্বাস নেওয়া (Rapid Breathing): শিশু বিশ্রামে থাকার বা ঘুমানোর সময়ও খুব দ্রুত শ্বাস নেয় বা বুক ধড়ফড় করে। শ্বাস নেওয়ার সময় পাঁজরের চামড়া ভেতরের দিকে ঢুকে যেতে পারে।

  • ত্বক বা ঠোঁটের নীলাভ ভাব (Cyanosis): রক্তে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতির কারণে শিশুর ঠোঁট, জিব, নখ বা গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে ধূসর বা নীলচে রঙের হয়ে যেতে পারে।

  • ঘন ঘন ঠাণ্ডা লাগা বা নিউমোনিয়া: এই শিশুদের ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্ত যাওয়ার কারণে তারা ঘন ঘন সর্দি-কাশি, বুক জ্যাম বা নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়।

বড় শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণ:

  • সমবয়সীদের তুলনায় খেলাধুলা বা দৌড়াদৌড়ি করার সময় খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া।

  • সামান্য শারীরিক পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড় করা।

  • মাঝে মাঝে বুক ব্যথা বা মাথা ঘুরে অজ্ঞান (Fainting) হয়ে যাওয়া।

  • হাত, পা, গোড়ালি বা পেটের অংশে জল জমে ফুলে যাওয়া।

জন্মগত হৃদরোগ নির্ণয় (Diagnosis of Congenital Heart Disease)

শিশুর শরীরে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বা সন্দেহ হলে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি। জন্মগত হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বেশ কিছু উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা রয়েছে। একজন দক্ষ কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসক সাধারণত নিম্নলিখিত উপায়ে রোগটি নির্ণয় করে থাকেন:

১. শারীরিক পরীক্ষা এবং হার্ট মারমার (Physical Exam & Heart Murmur): রুটিন চেক-আপের সময় চিকিৎসক যখন স্টেথোস্কোপ দিয়ে শিশুর বুক পরীক্ষা করেন, তখন হার্টের স্বাভাবিক শব্দের বাইরে একটি অতিরিক্ত ‘হুশিং’ বা শাঁ শাঁ শব্দ শুনতে পান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হার্ট মারমার’ (Heart Murmur) বলা হয়। এটিই হার্টের ফুটো বা ত্রুটির প্রথম প্রাথমিক সংকেত।

২. ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Fetal Echocardiography): এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি। বাচ্চা যখন মায়ের পেটে ভ্রূণ হিসেবে বড় হচ্ছে (সাধারণত গর্ভাবস্থার ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের মধ্যে), তখনই আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভস্থ ভ্রূণের হৃদযন্ত্রের নিখুঁত পরীক্ষা করা সম্ভব। যদি ভেন্ট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট (VSD) খুব বড় হয়, তবে তা ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফির মাধ্যমে সহজেই ধরা যেতে পারে। এর ফলে জন্মের আগেই বাচ্চার হার্টের অবস্থা জানা যায় এবং জন্মের পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসার প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া সম্ভব হয়।

৩. ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram / Pediatric Echo): জন্মের পর বাচ্চার হার্টের ফুটো নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর, নিরাপদ এবং বেদনাহীন পরীক্ষা হলো ইকোকার্ডিওগ্রাম। এটি হার্টের একটি আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা, যার মাধ্যমে স্ক্রিনে হার্টের লাইভ ছবি, প্রকোষ্ঠগুলোর আকার, ফুটোর অবস্থান এবং রক্তের প্রবাহ স্পষ্ট দেখা যায়।

৪. ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG): এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর হার্টের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ এবং হৃদস্পন্দনের ছন্দ (Heart Rhythm) পরিমাপ করা হয়, যা হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপের লক্ষণ বুঝতে সাহায্য করে।

৫. চেস্ট এক্স-রে (Chest X-Ray): বুকের এক্স-রে করার মাধ্যমে হার্টের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় কি না এবং ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্ত ও তরল জমেছে কি না তা যাচাই করা হয়।

৬. পাল্স অক্সিমেট্রি (Pulse Oximetry): শিশুর আঙুলে একটি ছোট সেন্সর লাগিয়ে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা (Oxygen Saturation Level) মাপা হয়।

যদি আপনার নবজাতকের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, তবে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় নবজাতকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর কাছে গিয়ে এই পরীক্ষাগুলো করিয়ে নেওয়া উচিত।

বাচ্চার হার্টের ফুটোর আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা (Modern Treatment Options)

অনেকেরই ধারণা, হার্টে ফুটো মানেই বুক কেটে বড় অপারেশন বা ওপেন হার্ট সার্জারি। কিন্তু বর্তমান যুগে চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতির ফলে কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসা অত্যন্ত উন্নত, সহজ ও নিরাপদ হয়ে উঠেছে। হার্টের ফুটোর চিকিৎসা মূলত নির্ভর করে ফুটোর আকার, অবস্থান এবং শিশুর শারীরিক কষ্টের তীব্রতার ওপর।

১. পর্যবেক্ষণ এবং স্বাভাবিক নিরাময় (Observation & Natural Closure): যদি বাচ্চার হার্টের ফুটো অত্যন্ত ছোট (Small Hole) হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসারই প্রয়োজন হয় না। বাচ্চার শারীরিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই ছোট ফুটোগুলো প্রাকৃতিক নিয়মেই নিজে থেকে ছোট হতে হতে একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তবে এই সময়ে নির্দিষ্ট ব্যবধানে একজন শিশুর হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে নিয়মিত ফলো-আপ বা ইকোকার্ডিওগ্রাম করাতে হয়।

২. ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা (Medical Management): ওষুধ দিয়ে সরাসরি হার্টের ফুটো বন্ধ করা যায় না, তবে মাঝারি বা বড় ফুটোর কারণে শিশুর যে কষ্ট বা সিম্পটম হয় তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফুসফুস ও শরীরে অতিরিক্ত তরলের চাপ কমাতে মূত্রবর্ধক বা ডাইইউরেটিক্স (Diuretics) ওষুধ দেওয়া হয়। অনেক সময় পুষ্টির অভাব দূর করতে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার বা বিশেষ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয় যাতে শিশুর ওজন ঠিকমতো বাড়ে।

৩. নন-সার্জিক্যাল বা ডিভাইস ক্লোজার পদ্ধতি (Non-Surgical / Interventional Device Closure): এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অনবদ্য আবিষ্কার। মাঝারি বা ছোট আকারের এএসডি (ASD), ভিএসডি (VSD) বা পিডিএ (PDA) এখন বুক না কেটে বা কোনো প্রকার মেজর অস্ত্রোপচার ছাড়াই পুরোপুরি ভালো করা সম্ভব। এই ইন্টারভেনশনাল পদ্ধতিতে শিশুর কুঁচকির (Groin) একটি ছোট রক্তনালীর মধ্য দিয়ে একটি অত্যন্ত সরু ও নমনীয় নল বা ক্যাথেটার (Catheter) হার্ট পর্যন্ত প্রবেশ করানো হয়। এরপর সেই ক্যাথেটারের সাহায্যে একটি ছাতার মতো বিশেষ ডিভাইস বা বোতাম (Device Closure) হার্টের ফুটোর জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়, যা ফুটোটিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। এতে কোনো কাটার দাগ থাকে না, রক্তপাত হয় না এবং শিশু মাত্র ১-২ দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে।

৪. সার্জিক্যাল ক্লোজার বা ওপেন হার্ট সার্জারি (Surgical Treatment): যদি ফুটোটি আকারে অত্যন্ত বড় (Large Hole) হয় অথবা হার্টের এমন এক জটিল জায়গায় থাকে যেখানে ডিভাইস বসানো সম্ভব নয়, তবে সার্জারির সাহায্য নিতে হয়। ডক্টর দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, বড় ফুটোর অপারেশন বা সার্জিক্যাল ক্লোজার সাধারণত বাচ্চার বয়স ১ বছর হওয়ার আগেই করে ফেলা উচিত, কারণ তাতে রেজাল্ট বা ফলাফল সবথেকে ভালো হয়। একজন দক্ষ পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে ফুটোটিতে একটি বিশেষ প্যাচ (Patch) বসিয়ে সেলাই করে দেন। সফল অপারেশনের পর শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায় এবং বড় হওয়ার পর বুকে একটি ছোট্ট হালকা স্কার (দাগ) ছাড়া বোঝার উপায় থাকে না যে তার হার্টের অপারেশন হয়েছিল।

কলকাতায় হার্টের ফুটো এবং হৃদরোগের চিকিৎসার ক্লিনিক ও হাসপাতাল (Clinics and Hospitals in Kolkata for Hole in Heart and Heart Disease Treatment)

কলকাতা বর্তমানে পূর্ব ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ এবং হার্টের ফুটো চিকিৎসার জন্য কলকাতায় বিশ্বমানের পরিকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের দল রয়েছে। নিচে কলকাতার কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নাম দেওয়া হলো যেখানে এই চিকিৎসা অত্যন্ত সফলতার সাথে করা হয়:

১. নারায়ণা হেলথ – আর.এন. টেগোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিয়াক সায়েন্সেস (RTIICS), মুকুন্দপুর: কলকাতার মুকুন্দপুরে অবস্থিত এই হাসপাতালটি পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বা শিশুদের হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য পূর্ব ভারতের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান। এখানে অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং স্বনামধন্য কনসালটেন্ট পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট আছেন, যিনি শিশুদের হার্টের ফুটো, ইন্টারভেনশনাল ক্যাথেটারাইজেশন এবং ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফিতে বিশেষজ্ঞ। এই হাসপাতালে অত্যন্ত সফলভাবে আধুনিক ডিভাইস ক্লোজার এবং ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়।

২. বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার (BM Birla Heart Research Centre): কলকাতার আলিপুরে অবস্থিত এই হাসপাতালটি কার্ডিয়াক কেয়ারের জন্য ভারতের অন্যতম অগ্রগণ্য প্রতিষ্ঠান। এখানে শিশুদের হৃদরোগ নির্ণয় এবং জটিল জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি ইউনিট ও আধুনিক ক্যাথ ল্যাব রয়েছে।

৩. অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালস (Apollo Multispecialty Hospitals): কাদাপাড়ার ই এম বাইপাসে অবস্থিত অ্যাপোলো হাসপাতালে বিশ্বমানের আধুনিক প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞ পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট ও সার্জনদের প্যানেল রয়েছে। নবজাতকদের জটিল হার্টের সমস্যার জন্য এদের নিওনেটাল কার্ডিয়াক আইসিইউ (NICU) অত্যন্ত উন্নত।

৪. সরকারি হাসপাতাল (যেমন-এসএসকেএম এবং আরজিকর হাসপাতাল): যাঁরা অত্যন্ত কম খরচে বা বিনামূল্যে চিকিৎসা করাতে চান, তাঁদের জন্য কলকাতার এসএসকেএম (SSKM/IPGMER) হাসপাতালের পিডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য স্থান। এখানে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুদের হার্টের ফুটোর অপারেশন ও ডিভাইস ক্লোজার সফলভাবে করা হয়।

উপসংহার (Conclusion)

বাচ্চার হার্টে ফুটো থাকা নিশ্চিতভাবেই মা-বাবার জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়, তবে এটি নিয়ে ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই। সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই শিশুরা বড় হয়ে সাধারণ মানুষের মতোই পড়াশোনা, খেলাধুলা, চাকরি এবং স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন উপভোগ করতে পারে। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেক-আপ এবং জন্মের পর শিশুর মধ্যে কোনো রকম অস্বাভাবিক লক্ষণ (যেমন দুধ খাওয়ার সময় হাঁপিয়ে ওঠা, অতিরিক্ত ঘাম বা ওজন না বাড়া) দেখা দিলে বিলম্ব না করে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই আপনার আদরের সন্তানের মুখে আজীবন সুস্থ হাসি ধরে রাখতে পারে।

 

শিশুদের হার্টের ফুটো সংক্রান্ত কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)

শিশুর হার্টে ফুটো বা জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে মা-বাদের মনে অনেক রকমের প্রশ্ন ও সংশয় থাকে। এখানে অত্যন্ত সহজ ভাষায় কিছু জরুরি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:

বাচ্চার হার্টে ফুটো থাকলে কি অপারেশন করা বাধ্যতামূলক?

না, সব বাচ্চার ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসার সিদ্ধান্তটি মূলত নির্ভর করে ফুটোটির আকার (Size) এবং অবস্থানের ওপর। যদি ফুটোটি আকারে খুব ছোট হয়, তবে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই তা সময়ের সাথে নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে মাঝারি বা বড় আকারের ফুটোর ক্ষেত্রে ওষুধ, ডিভাইস ক্লোজার অথবা অপারেশনের প্রয়োজন হয়।

হার্টের ফুটো কি প্রাকৃতিক নিয়মে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে?

হ্যাঁ, অনেক সময়ই ছোট আকারের অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট (ASD) বা ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (VSD) শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিক নিয়মে নিজে থেকেই ছোট হয়ে বুজে যায়। এই সময়ে কোনো অপারেশনের দরকার পড়ে না, তবে একজন কলকাতায় শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর অধীনে নিয়মিত ইকোকার্ডিওগ্রাম করে বাচ্চার হার্টের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

গর্ভাবস্থায় কি বাচ্চার হার্টের ফুটো সনাক্ত করা সম্ভব?

হ্যাঁ, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাহায্যে গর্ভাবস্থার ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের মধ্যে 'ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফি' (Fetal Echocardiography) নামক একটি বিশেষ আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভস্থ ভ্রূণের হার্টের গঠন এবং কোনো জন্মগত ত্রুটি বা বড় ফুটো আছে কি না, তা নিখুঁতভাবে সনাক্ত করা সম্ভব।

বুক না কেটে বা অপারেশন ছাড়া কি হার্টের ফুটো বন্ধ করা যায়?

হ্যাঁ, বর্তমান যুগে এটি সম্পূর্ণ সম্ভব। একে বলা হয় নন-সার্জিক্যাল ডিভাইস ক্লোজার (Device Closure) পদ্ধতি। এই আধুনিক ব্যবস্থায় শিশুর কুঁচকির রক্তনালী দিয়ে একটি সরু ক্যাথেটার হার্ট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং ফুটোর মুখে একটি ছোট ছাতা বা বোতামের মতো ডিভাইস বসিয়ে দেওয়া হয়। এতে কোনো বড় কাটাছেঁড়া বা দাগ থাকে না এবং শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে।

হার্টে ফুটো থাকা শিশুরা কি বড় হয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারে?

অবশ্যই। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা (সেটি ওষুধের মাধ্যমে হোক, ডিভাইস দিয়ে বা সার্জারির মাধ্যমে) করালে এই শিশুরা বড় হয়ে অন্য পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতোই পড়াশোনা, খেলাধুলা, চাকরি এবং স্বাভাবিক বৈবাহিক জীবনযাপন করতে পারে। চিকিৎসায় দেরি না করলে এদের আয়ু বা জীবনযাত্রার মান সাধারণ মানুষের মতোই হয়।

নবজাতক শিশুর হার্টে ফুটো থাকার প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?

নবজাতক বা ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষণগুলো হলো-

  • মায়ের দুধ খাওয়ার সময় বাচ্চার অতিরিক্ত হাঁপিয়ে ওঠা এবং কপালে-মাথায় প্রচুর ঘাম হওয়া।
  • সমবয়সী বাচ্চাদের তুলনায় শরীরের সঠিক বৃদ্ধি বা ওজন না বাড়া।
  • বাচ্চা বিশ্রামে থাকা অবস্থাতেও খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
  • ঠোঁট, জিব বা নখের চারপাশ ফ্যাকাশে বা নীলচে (Cyanosis) হয়ে যাওয়া।
  • ঘন ঘন ঠাণ্ডা লাগা, কাশি বা বুকে কফ জমার মতো সমস্যা হওয়া।

যদি আপনার শিশুর মধ্যে এই ধরণের কোনো লক্ষণ লক্ষ্য করেন, তবে অবহেলা না করে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় নবজাতকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বা কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসক-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আমি কীভাবে ডক্টর দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে কনসালটেশন বা পরামর্শ করতে পারি?

ডক্টর দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে কনসালটেশন বা পরামর্শের সময় নির্ধারণ করার জন্য আপনি কলকাতার আর. এন. টেগোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিয়াক সায়েন্সেস (R N Tagore International Institute of Cardiac Sciences)-এ যোগাযোগ করতে পারেন এবং সেখানে অ্যাপয়েন্টমেন্টের উপলব্ধতা (Availability) সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিতে পারেন কিংবা কল করতে পারেন +91 8585077458 নম্বরে।

Disclaimer: এই নিবন্ধটি কেবল তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি কোনোভাবেই চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ হিসেবে বিবেচিত নয়। আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য সর্বদা একজন যোগ্যতাসম্পন্ন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

অন্যান্য ব্লগগুলো পড়ুন:

Follow Me on Youtube & Facebook