“কাওয়াসাকি রোগ – লক্ষণ, কারণ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা” – ডা. দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা (পেডিয়াট্রিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, কলকাতা, ভারত)
নমস্কার, কলকাতায় দীর্ঘ বছর ধরে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট বা শিশুদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি ডঃ দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় বহু শিশুর চিকিৎসা করে আসছি। আজ আমি আপনাদের সাথে এমন একটি রোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে প্রায়ই নির্ণয় করা হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি নিয়ে সচেতনতা বেশ কম। রোগটির নাম হলো কাওয়াসাকি রোগ (Kawasaki Disease)।
সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগটি বেশি দেখা যায়। সঠিক সময়ে রোগটি সনাক্ত করা না গেলে এটি শিশুর হৃদযন্ত্র বা হার্টের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে এই রোগের লক্ষণ, কারণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে রাখা আপনার সন্তানের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কাওয়াসাকি রোগ কী? (Kawasaki Disease: Symptoms, Causes & Treatment Options)
কাওয়াসাকি রোগ হলো শিশুর শরীরের রক্তনালীগুলোর একটি প্রদাহজনিত সমস্যা (Vasculitis)। এটি মূলত শরীরের মাঝারি আকারের ধমনীগুলোকে আক্রান্ত করে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, এই রোগটি হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান ধমনী বা করোনারি ধমনী (Coronary Artery)-কে আক্রান্ত করতে পারে। যখন কোনো শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়, তখন তার রক্তনালীগুলোতে তীব্র প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন তৈরি হয়।
যদি আপনি আপনার সন্তানের হার্টের সুরক্ষার জন্য একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর পরামর্শ নিতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই এই রোগের তীব্রতা সম্পর্কে জানতে হবে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে করোনারি ধমনীগুলো ফুলে গিয়ে অ্যানিউরিজম (Aneurysm) বা স্থায়ীভাবে প্রসারিত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে পরবর্তীতে রক্ত জমাট বাঁধা বা হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে আশার কথা হলো, প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় করে আধুনিক চিকিৎসা শুরু করলে এই জটিলতা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কাওয়াসাকি রোগের কারণসমূহ (Causes of Kawasaki Disease)
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির পরেও কাওয়াসাকি রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; অর্থাৎ এটি এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে ছড়ায় না বা বংশগতভাবে সরাসরি স্থানান্তরিত হয় না।
চিকিৎসা গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন (Specific Viral Illness) বা ভাইরাসের আক্রমণের পর শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমে এক ধরনের অনিয়ম বা ইমিউন ডিসরেগুলেশন (Immune Dysregulation) ঘটে। সহজ কথায়, ইনফেকশন চলে যাওয়ার পরেও শিশুর নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ভাইরাসের পরিবর্তে শরীরের নিজস্ব সুস্থ রক্তনালীগুলোকে আক্রমণ করতে শুরু করে। বিশেষ করে যেসব শিশুর মধ্যে এই রোগের জিনগত প্রবণতা (Genetic Susceptibility) থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এই ধরণের প্রতিক্রিয়া বেশি দেখা যায়।
কাওয়াসাকি রোগের প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms of Kawasaki Disease)
কাওয়াসাকি রোগটি হঠাৎ করেই দেখা দেয় এবং এটি কয়েকটি ধাপে (Phases) শিশুর শরীরে বিবর্তিত হয়। রোগের প্রথম সপ্তাহে সাধারণত তীব্র জ্বর থাকে এবং পরবর্তী ধাপে অন্যান্য শারীরিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে।
লক্ষণগুলোকে মূলত নিচে দেওয়া প্রধান কয়েকটি ভাগে চেনা যায়:
টানা উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর: শিশুকে কাওয়াসাকি আক্রান্ত বলে সন্দেহ করার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো—কোনো সাধারণ কারণ ছাড়াই শিশু একটানা ৫ দিন বা তার বেশি সময় ধরে তীব্র জ্বরে (High-grade Temperature) ভুগবে। এই জ্বর সাধারণ প্যারাসিটামল বা অ্যান্টিবায়োটিকে সহজে কমে না।
চোখ লাল হওয়া: শিশুর দুটি চোখই অতিরিক্ত লাল হয়ে যায় (Conjunctival Injection)।
মুখ, ঠোঁট ও জিভের পরিবর্তন: শিশুর ঠোঁট অতিরিক্ত লাল হয়ে ফেটে যায় এবং জিভটি দেখতে হুবহু স্ট্রবেরির মতো লালচে গুটি গুটি (Strawberry Tongue) দেখায়। মুখের ভেতরের অংশও লাল হয়ে যেতে পারে।
শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি: শিশুর সারা গায়ে, বিশেষ করে পিঠে, বুকে, পেটে এবং কুঁচকির অংশে লাল লাল র্যাশ বা অ্যালার্জির মতো ফুসকুড়ি দেখা যায়।
হাত ও পায়ের তালু ফুলে যাওয়া: প্রাথমিক অবস্থায় শিশুর হাত ও পায়ের পাতা লাল হয়ে ফুলে যায় এবং শক্ত হয়ে যায়, যার কারণে শিশু হাঁটতে বা কোনো কিছু ধরতে তীব্র অস্বস্তি প্রকাশ করে।
গলার গ্রন্থি ফুলে যাওয়া: শিশুর গলায় বা ঘাড়ের যেকোনো একপাশে লিম্ফ নোড বা লিম্ফ গ্রন্থি ফুলে যায় (Cervical Lymphadenopathy), যা সাধারণত আকারে ১.৫ সেন্টিমিটারের চেয়ে বড় হয়।
রোগের পরবর্তী ধাপের লক্ষণ (দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহ): প্রথম সপ্তাহের পর বা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুর দিকে শিশুর হাত ও পায়ের আঙুলের ডগা থেকে চামড়া ছাড়াতে (Skin Peeling) শুরু করে। এর পাশাপাশি শিশুর পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া এবং জয়েন্টে ব্যথা বা গাঁটে গাঁটে ব্যথার (Joint Pain) মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা (Diagnosis & Modern Treatment)
কাওয়াসাকি রোগ নির্ণয় (Diagnosis): কাওয়াসাকি রোগ নির্ণয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো একক রক্ত পরীক্ষা বা ল্যাব টেস্ট নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি ক্লিনিকাল ডায়াগনোসিস (Clinical Diagnosis)। অর্থাৎ, রোগীর শরীরে প্রকাশ পাওয়া লক্ষণগুলো (যেমন ৫ দিনের জ্বর এবং বাকি ৫টি লক্ষণের মধ্যে অন্তত ৪টি) দেখে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক রোগটি সনাক্ত করেন। তবে রোগ নির্ণয়কে নিশ্চিত করতে এবং হার্টের অবস্থা বুঝতে কিছু ল্যাবরেটরি টেস্টের সাহায্য নেওয়া হয়:
রক্ত পরীক্ষা (Blood Tests): রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায় যে শরীরে প্রদাহের মাত্রা অনেক বেশি (High ESR & CRP)। কাওয়াসাকি রোগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিকাল ক্লু বা সংকেত হলো—রক্তে প্লেটলেট কাউন্ট (Platelet Count) বা অণুচক্রিকার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া (Rising Platelet Count)।
ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram/Echo): কাওয়াসাকি রোগের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা হলো হৃদপিণ্ডের আল্ট্রাসাউন্ড বা ইকোকার্ডিওগ্রাম। একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় নবজাতকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি প্রতিটি সন্দেহভাজন শিশুর ইকো করার পরামর্শ দিই। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর করোনারি ধমনীতে কোনো প্রদাহ আছে কিনা, ধমনীর আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে ফুলে গেছে কিনা (Aneurysm), হার্টের ভালভের কোনো সমস্যা আছে কিনা কিংবা হার্টের পেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে কিনা—তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে।
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা (Treatment Options): কাওয়াসাকি রোগ ধরা পড়ার পর শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করতে হয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার দুটি মূল ধাপ রয়েছে:
প্রথম ধাপ (First Line Treatment): রোগ নির্ণয় হওয়ার সাথে সাথে First Line Treatment হিসেবে হাই ডোজ ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন (IVIG) এবং উচ্চ মাত্রায় অ্যাসপিরিন (High-dose Aspirin) দেওয়া হয়। IVIG হলো মূলত সুস্থ রক্ত থেকে সংগৃহীত অ্যান্টিবডি, যা শিশুর ইমিউন সিস্টেমের অনিয়মকে নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রক্তনালীর প্রদাহ দ্রুত কমায়। অন্যদিকে, অ্যাসপিরিন জ্বর কমাতে এবং করোনারি ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। অধিকাংশ শিশুই এই ফার্স্ট লাইন চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় ধাপ (Second Line Treatment): প্রায় ১০-১৫% শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ IVIG দেওয়ার পরেও জ্বর কমে না (IVIG-resistant Kawasaki Disease)। তাদের জন্য সেকেন্ড লাইন চিকিৎসা হিসেবে দ্বিতীয়বার IVIG দেওয়া হয়, অথবা উচ্চ ক্ষমতার স্টেরয়েড (Steroids) এবং আধুনিক ইমিউনোমডুলেটরি থেরাপি (যেমন— Infliximab) ব্যবহার করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদী ফলো-আপ এবং সতর্কতা: চিকিৎসার পর শিশুর নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত জরুরি। যদি রোগ সনাক্তকরণের সময় শিশুর করোনারি ধমনীর কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, তবে তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে লো-ডোজ অ্যাসপিরিন (Low-dose Aspirin) সেবন করতে হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কাওয়াসাকি রোগের চিকিৎসা যদি প্রথম সপ্তাহের মধ্যে অর্থাৎ জ্বর শুরু হওয়ার ৭ দিনের মধ্যে (Early Treatment) শুরু করা যায়, তবে হার্টের জটিলতার ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নেমে আসে। চিকিৎসায় যত দেরি হবে, কমপ্লিকেশন বা জটিলতা বাড়ার সম্ভাবনা ততটাই বেশি।
কলকাতায় কাওয়াসাকি রোগ এবং হৃদরোগের চিকিৎসার ক্লিনিক ও হাসপাতাল
আজকের দিনে কলকাতায় শিশুদের হার্টের রোগের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত আধুনিক ও বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। আপনার শিশু যদি কাওয়াসাকি রোগ বা জন্মগত কোনো হার্টের সমস্যায় ভুগে থাকে, তবে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি ডঃ দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতার আর. এন. টেগোর হাসপাতাল (R. N. Tagore Hospital, Mukundapur, Kolkata)-এ সিনিয়র পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে কর্মরত আছি। আমাদের হাসপাতালে নবজাতক থেকে শুরু করে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সমস্ত শিশুর হার্টের জটিল সমস্যার চিকিৎসার সব ধরণের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে।
কলকাতায় আপনার সন্তানের হার্টের যেকোনো সমস্যায় আপনি একজন অভিজ্ঞ কলকাতায় শিশুদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ-এর পরামর্শ নিতে পারেন। শিশুদের জন্মগত হার্টের ত্রুটি বা অন্যান্য অর্জিত হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য বর্তমানে কলকাতায় অত্যন্ত দক্ষ চিকিৎসকের টিম রয়েছে। জেনে রাখুন সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে জন্মগত হার্টের ফুটো বা রক্তনালীর সমস্যা এখন সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে কলকাতায় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসা এখন অত্যন্ত নিরাপদ এবং এর সাফল্যের হারও আন্তর্জাতিক মানের সমতুল্য।
উপসংহার
অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে আমার একটাই বার্তা—আপনার শিশু যদি একটানা ৫ দিন বা তার বেশি সময় ধরে তীব্র জ্বরে ভোগে এবং তার সাথে চোখ লাল হওয়া, ঠোঁট-জিভ লাল হওয়া, হাত-পা ফুলে যাওয়া বা গায়ে র্যাশের মতো লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে সেটিকে সাধারণ জ্বর মনে করে অবহেলা করবেন না। অবিলম্বে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের সাথে যোগাযোগ করুন এবং প্রয়োজনে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই আপনার সন্তানকে কাওয়াসাকি রোগের হাত থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে পারে।
ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আপনার শিশুর হৃদপিণ্ডের যত্ন নিন।


Pingback: জন্মগত হার্টের রোগের কারণ ও চিকিৎসা – Dr. Debasree Gangopadhyay – Best Paediatric cardiologist in Kolkata, India
Pingback: গর্ভাবস্থায় বাচ্চার হার্টের রোগ: লক্ষণ, কারণ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা – Dr. Debasree Gangopadhyay – Best Paediatric cardiologist
Pingback: বাচ্চার হার্টে ফুটো কি? বাচ্চার হার্টের ফুটোর কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা – Dr. Debasree Gangopadhyay – Best Paediatric cardiologist in Kolkat